Wednesday, 3 July 2019

মেখলাপুরের যাত্রী (The passenger to Mekhlapur)

মেখলাপুরের যাত্রী
=============
লেখক - সৌরভ নন্দী
---------------------------------
বাসটা ছাড়ার পর শুভ বলল, “এই রাজেশদা! এই ট্রিপটার কোনো দরকার ছিল কি? তোকে বললাম তো, এই বৃষ্টির রাতে প্যাসেঞ্জার পাবি না একটাও...”
বিড়িটা জানলা দিয়ে ফেলে দিয়ে স্টিয়ারিংটা ভুঁড়ির নিচে আটকে ঢকঢক করে জল খেল রাজেশ। তারপর বোতলটা রেখে স্টিয়ারিংটা আবার হাতে নিয়ে বলল, “দূর বা*, সবে আটটা বাজে। বংগীপাড়ার মোড়ে ঠিক প্যাসেঞ্জার পাবি...”
শুভ আর কোন কথা না বলে সিটে বসল। গেটে দাঁড়িয়ে লাভ নেই। কেউ উঠবে না। ব্যাগটা পাশে রেখে জানলায় হেলান দিয়ে একটা বিড়ি ধরাল সেও।
রাজেশ গান চালাল এফএমএ... শালা গান শোনাবার নাম নেই খালি আলবাল বকে যাচ্ছে। মাথা ধরিয়ে দেয়। মেখলাপুরে পৌঁছতে এখন একঘণ্টা। বাস হু হু করে ছুটিয়ে নিয়ে চলেছে রাজেশ। রাস্তা ফাঁকা, কটা বাইক আর টোটো... ও বাওয়া... ফণীর দোকানমোড়ে আবার লাইট অফ... লোডশেডিং নাকি রে ভাই...
ফণীর দোকানমোড় পেরিয়ে গেল। সামনে হরিশপাড়া ব্রিজ... ব্রিজে ওঠার মুখে কে একটা হাত দেখাচ্ছে... প্যাসেঞ্জার নাকি! রাজেশ বাস স্লো করল... শুভ ব্যাগটা নিয়ে গেটে এগিয়ে গেল... একটা টাকমাথা পাজামা পাঞ্জাবি পরা লোক গেটের কাছে এসে ঘড়ঘড়ে গলায় জিজ্ঞেস করল “মেখলাপুর যাবে?” শুভ জবাব দিল, “যাবে যাবে উঠুন...” লোকটা উঠতে বেল মেরে দিল শুভ, “চল!” রাজেশ আবার স্পিড বাড়াল।
আজব লোক মাইরি বাসের পিছনদিকে গিয়ে বসল... প্যাসেঞ্জার নেই বলে লাইট মারেনি রাজেশ... “ও দাদা সামনের দিকে এসে বসুন না...” লোকটা সেই ঘড়ঘড়ে গলায় উত্তর দিল, “এখানেই বসি। ভালো লাগছে...” “গা* নাকি বে...” মনে মনে বলল শুভ। যাকগে... শুভ আবার সিটে বসল...
ব্রিজের মাঝবরাবর এসে আবার কে একটা লোক হাত দেখাচ্ছে... ঝমঝমে বৃষ্টি... রাস্তার এপাশের লাইটটা খারাপ নাকি! রাজেশ আবার স্লো করল... শুভ এবার জানলা দিয়ে উঁকি মারল... “মেখলাপুর যাবে?” সব শালা বৃষ্টিতে ভিজে ঠাণ্ডা লাগাচ্ছে নাকি? সব ঘড়ঘড়ে গলায় কথা বলছে... শুভ জবাব দিল, “যাবে যাবে উঠে পড়ুন...” লোকটা উঠতে শুভ দেখল এও শালা টাক মাথা...পাঞ্জাবি পরা... পুরো ভিজে...!!! এও বাঁ* সেই পিছনে গিয়ে বসল... এমনি তে পাব্লিককে পিছনে পাঠাতে তো ফেটে যায়... আজব মাইরি!!
রাজেশ গিয়ার চেঞ্জ করে এবার স্পিড তুলল আরো...
বিড়িটা ধরাতে গিয়েও শুভ ধরাল না। কি মনে হল একবার পিছনদিকে তাকাল... হালকা আলোয় প্যাসেঞ্জার দুজনকে দেখা যাচ্ছে ছায়ামূর্তির মত। কি রকম একটা লাগল শুভর... একবার উঠে পিছন দিকে এগিয়ে যেতে গিয়েও থেমে গেল... হাঁক দিয়ে জিজ্ঞেস করতে গেল, “আপনারা মেখলাপুরেই নামবেন?” কিন্তু করল না... বরং রাজেশের দিকে এগিয়ে গেল। রাজেশ চুপচাপ স্টিয়ারিং ধরে বাস ছুটিয়ে নিয়ে চলেছে... শুভ কাছে গিয়ে নিচু স্বরে বলল, “দুটো প্যাসেঞ্জার...”। রাজেশ কিন্তু স্বাভাবিক গলাতেই বলল, “তোকে বললাম তো প্যাসেঞ্জার পাবি। বেকার চাপ নিচ্ছিলি। যা গিয়ে টিকিটটা কাট!” শুভ বলল, “পিছনের লাইটটা দে...”
“কেন?”
“আরে, ওরা মাল পিছনে গিয়ে বসেছে।“
খ্যাঁক খ্যাঁক করে রাজেশ হেসে বলল, “পুরো সতী প্যাসেঞ্জার নাকি বে!” সুইচের দিকে হাত বাড়াল রাজেশ।
কিন্তু একি! পিছনের লাইট জ্বলল না তো। রাজেশ বেশ কয়েকবার সুইচ অন অফ করে থেমে গেল।
“কি হল?”
“গেছে বা*টা! পরশুদিনই তো বার বার কেটে যাচ্ছিল, তোদের বিমুদাকে বললাম তো সারাবার কথা। পাত্তাই দিল না।”
“ধুর বাঁ* !!!”
শুভ টিকিট কাটতে গেল না... নিজের সিটে গিয়ে বসল।
ব্রিজ থেকে নামার পর ডাইনে ঘুরে বংগীপাড়ার মোড়। নাহ রাজেশের কথা মিথ্যে করে এখানে কোন প্যাসেঞ্জার উঠল না। বরং আর একটা স্টপেজের পর বাঁয়ে ঘুরতেই একটা টেম্পো দাঁড়িয়ে। শুভর মাথাটা গরম হয়ে গেল। বৃষ্টিতে আবার নামতে হবে !!! সে গলা বাড়িয়ে চেঁচাল, “এ ভাই এগা না বে!”। টেম্পোর চালকটা ভেতরে বসে মোবাইলে কথা বলছিল, হাঁক শুনে সেই ভাবেই একটু বামদিকে এগিয়ে নিয়ে গেল গাড়িটা। “যা বাঁয়ে যা... যা বাঁয়ে... যা সিধে !!!” বাসটা এগিয়ে গেল। সামনের লাইটপোস্টের কাছে আবার প্যাসেঞ্জার !!!
শুভ এবার চুপ করে রইল। ওর কেমন যেন একটা লাগছে... এই প্যাসেঞ্জারটাও ...
টাক মাথা – পাঞ্জাবি পরা – পুরো ভিজে – ঘড়ঘড়ে গলা। “মেখলাপুর যাবে?” শুভ জবাব দিল না। প্যাসেঞ্জার উঠে পিছনে অন্ধকার দিকে এগিয়ে গেল।
টিকিট কাটতে যেতে কেমন যেন ভয় ভয় লাগছে শুভর... পিছন থেকে তিনজনেই যেন ঘড়ঘড়ে গলায় বলে উঠল, “দাদা টিকিটটা নেবেন।”
শুভ উঠল না সিট ছেড়ে। সে একটা মরীয়ামত গলায় জোরে বলল, “স্ট্যান্ডে নিয়ে নেব। বসুন আপনারা।”
আর তিনটে স্টপেজ। তারপরই মেখলাপুর। এই তিনটে স্টপেজ অন্য সবসময়ই প্রায় নির্জন থাকে। এদিকটা একটু গ্রাম গ্রাম ধরণের। আর এই তিনটে স্টপেজের দূরত্বটাও বেশি। রাজেশ চুপচাপ বাস ছুটিয়ে চলেছে। এফএম বন্ধ করে দিয়েছে সেই কখন। শুভ চুপচাপ বিড়ির পর বিড়ি খেয়ে যাচ্ছে। জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে... রাস্তা শুনশান।
তিনটে স্টপেজ। আশ্চর্য এই বৃষ্টির রাতে তিনটে স্টপেজেই প্যাসেঞ্জার উঠল। শুভ এবার প্রায় সিটের সঙ্গে মিশে গেছে। কোন রকমে উঠে দাঁড়াল। রড ধরে প্রায় টলতে টলতে রাজেশের কাছে গিয়ে ধপ করে বসল। গলা শুকিয়ে গেছে তার।
“রা – রাজু – রাজেশভাই...”
“কি বে?”
“আমার – আমার ভয় করছে।“
“কি হয়েছে বাঁ*! দে একটা বিড়ি দে!”
“প্যাসেঞ্জারগুলো দেখলি?”
“নাহ সেভাবে দেখিনি, কেন কি হয়েছে? পাজামা পাঞ্জাবি পরা ছাতা নেয়নি বাঁ*, পুরো ভিজে ন্যাকড়া।”
“ওরা... ওদের সব কটাকে একদম...”
“কি?”
“একরকম দেখতে!”
“ধুর বাঁ* কি বকছিস। মাল এনেছিস নাকি পকেটে? খাসনি! বেআইনি জানিস তো বাঁ*” বলে রাজেশ আবার খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসল।
“মাইরি বলছি। মাক্কালি বলছি। তুই দেখ নিজে। সবাই টাকমাথা। সবাই পাঞ্জাবি পরা। ঘড় ঘড় করে কথা বলছে। মেখলাপুর যাবে। সবকটা... পাঁচজন আছে... তুই দেখ গিয়ে। সবাই পিছনে গিয়ে বসেছে।”
“কি বলছিস কি! লাইটটা জ্বলছে না... এগুলোও পাওয়ারটা কম। ভুল দেখেছিস!”
শুভ মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে চাপা গলায় চেঁচিয়ে উঠল, “ধুর বাঁ*! তুই নিজে দেখ না।“ এবার গলায় আর্তস্বর, “আমার ভয় লাগছে মাইরি! কি কেস বলত? এমনিতে একটাও প্যাসেঞ্জার হয় না এমন বৃষ্টির রাতে! আজ পাঁচজন এক চেহারার ! ভূত নাকি মাইরি!”
“দাঁড়া! বাসটা সাইড করি!” রাজেশ স্টিয়ারিং ঘোরাল। মেখলাপুর আর সামনের মোড়টা ঘুরেই কাল্ভার্টটা পেরিয়েই। শুভ এমন করছে কেন?
রাজেশ ব্রেক কষল।
ড্রাইভারের সিট থেকে বামদিকে বেরিয়ে এল। গিয়ারের হ্যান্ডেলটা ডিঙ্গিয়ে নেমে এল। সিটের দিকে এগিয়ে যেতেই শুভ আর রাজেশের শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। বাসের দরজাটা কে বন্ধ করল?
পিছনের অন্ধকারে পাঁচজন! না! পাঁচজন না! কিভাবে যেন প্রায় সাতজন প্যাসেঞ্জার... গুনতে পারেনি শুভ... সবকটা প্যাসেঞ্জার অন্ধকার থেকে এগিয়ে আসছে। সবাই ঘড়ঘড়ে গলায় বলছে..। একটানা সুরে, “বাস থামালেন কেন? মেখলাপুর যাবে না? ও দাদা! মেখলাপুর যাবে না? ও দাদা! মেখলাপুর যাবে না?” বাসের টিমটিমে আলোয় দেখতে পাচ্ছে শুভ আর রাজেশ, ওদের দেখতে একদম এক রকম। টাকমাথা, ভিজে সাদা পাজামা পাঞ্জাবি! শুধু চোখ... চোখের মণি নেই...
জ্ঞান হারানোর আগে দুজনেই শুনতে পেল। বাসের দরজা ধাক্কাচ্ছে কে যেন, “ও দাদা! ও দাদা! বাসটা মেখলাপুর যাবে?”
(সমাপ্ত)
------------------------------